বিশ্ববিদ্যালয়ের করিডরে মাদকের ছায়া: হারিয়ে যাচ্ছে কি আমাদের তরুণ প্রজন্ম?
মো:নাজমুল হাসান
শিক্ষার্থী, সিটি ইউনিভার্সিটি
একজন তরুণ যখন বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হন, তখন তাঁর চোখে থাকে অসংখ্য স্বপ্ন। কেউ গবেষক হতে চান, কেউ উদ্যোক্তা, কেউবা পরিবারের অভাব ঘুচিয়ে সুন্দর ভবিষ্যৎ গড়তে চান। বিশ্ববিদ্যালয় শুধু ডিগ্রি অর্জনের জায়গা নয়; এখান থেকেই তৈরি হয় দেশের ভবিষ্যৎ নেতৃত্ব। কিন্তু সেই স্বপ্নের পথে মাদক যখন বাধা হয়ে দাঁড়ায়, তখন ক্ষতিগ্রস্ত হয় শুধু একজন শিক্ষার্থী নয়, একটি পরিবার এবং সমাজের সম্ভাবনাও।
বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষার্থীদের মধ্যে মাদক ব্যবহারের বিষয়টি নিয়ে আলোচনা হলেই প্রায়ই দায় চাপানো হয় শিক্ষার্থীদের ওপর। কিন্তু সমস্যাটির গভীরে রয়েছে আরও কিছু বিষয়—বন্ধুমহলের চাপ, কৌতূহল, মানসিক সংকট, পারিবারিক দূরত্ব এবং মাদকের সহজলভ্যতা। এসব কারণ বুঝতে না পারলে শুধু দোষারোপ করে সংকটের সমাধান সম্ভব নয়।
উদ্বেগের কারণ কি কেবল শোনা কথা?
বাংলাদেশের সব বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের মধ্যে মাদক ব্যবহারের সুনির্দিষ্ট হার নির্ধারণের জন্য আরও বিস্তৃত গবেষণা প্রয়োজন। তবে বিদ্যমান গবেষণাও উদ্বেগের কারণ সামনে এনেছে।
২০২৫ সালে বাংলাদেশের চারটি সরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের ৫০৯ জন শিক্ষার্থীকে নিয়ে পরিচালিত একটি গবেষণা BMC Public Health সাময়িকীতে প্রকাশিত হয়। গবেষণায় অংশগ্রহণকারীদের ১৬.১ শতাংশ আগের ৩০ দিনে কোনো না কোনো মাদকদ্রব্য ব্যবহারের কথা জানান। জীবনের কোনো এক পর্যায়ে ব্যবহারের কথা জানান ২৫.১ শতাংশ।
অবশ্য এই পরিসংখ্যান বাংলাদেশের সব বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের প্রতিনিধিত্ব করে না। গবেষণাটি চারটি সরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিল। তবু এর ফলাফল বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ে মাদক ব্যবহার নিয়ে আরও গুরুত্বের সঙ্গে কাজ করার প্রয়োজনীয়তা তুলে ধরে।
এখানে মনে রাখা জরুরি, মাদক ব্যবহার এবং মাদকাসক্তি এক বিষয় নয়। তবে মাদক ব্যবহারের শুরু থেকে নির্ভরশীলতায় পৌঁছানোর ঝুঁকি সম্পর্কে সচেতন থাকা প্রয়োজন।
কৌতূহল থেকে ভয়াবহ পরিণতি
একজন শিক্ষার্থী কেন মাদকের দিকে ঝুঁকছেন, তার উত্তর সবার ক্ষেত্রে এক নয়। কেউ বন্ধুর চাপে, কেউ কৌতূহল থেকে, আবার কেউ মানসিক চাপ ভুলে থাকার আশায় মাদক গ্রহণ করতে পারেন। বিশ্ববিদ্যালয়ে নতুন পরিবেশে মানিয়ে নেওয়া, পড়াশোনার চাপ, সম্পর্কের টানাপোড়েন কিংবা ভবিষ্যৎ নিয়ে অনিশ্চয়তা কারও কারও জন্য বাড়তি মানসিক চাপ তৈরি করতে পারে।
তবে মানসিক চাপে থাকা প্রত্যেক শিক্ষার্থী মাদকের দিকে ঝুঁকবেন, এমন নয়। সমস্যা তৈরি হয় যখন সংকট মোকাবিলার স্বাস্থ্যকর উপায় ও প্রয়োজনীয় সহায়তা সহজে পাওয়া যায় না।
মাদকের ধরন ও ব্যবহারের মাত্রা অনুযায়ী স্মৃতিশক্তি, মনোযোগ, বিচারবোধ এবং মানসিক স্বাস্থ্যে নেতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে। নিয়মিত ব্যবহার পড়াশোনা, পারিবারিক সম্পর্ক ও ভবিষ্যৎ কর্মজীবনকেও ক্ষতিগ্রস্ত করতে পারে। সাময়িক স্বস্তির আশায় নেওয়া একটি সিদ্ধান্ত কখনো কখনো দীর্ঘমেয়াদি সংকটের কারণ হয়ে দাঁড়ায়।
বন্ধুত্বের নামে চাপ, নাকি নীরব সমর্থন?
বিশ্ববিদ্যালয়জীবনে বন্ধুত্ব মানুষের বড় শক্তি। কিন্তু বন্ধুত্বের নামে কাউকে মাদক গ্রহণে উৎসাহিত করা কিংবা মাদক গ্রহণে অস্বীকৃতি জানালে উপহাস করা কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়।
নিজের সিদ্ধান্তে অটল থাকা দুর্বলতা নয়; বরং অন্যের চাপে নিজের ক্ষতি না করাই দায়িত্বশীলতার পরিচয়।
শিক্ষার্থী, ছাত্রসংগঠন, সাংস্কৃতিক সংগঠন ও ক্রীড়া সংগঠনগুলো এ ক্ষেত্রে ইতিবাচক ভূমিকা রাখতে পারে। মাদকবিরোধী কার্যক্রম শুধু ব্যানার, পোস্টার কিংবা দিবসভিত্তিক কর্মসূচিতে সীমাবদ্ধ না রেখে শিক্ষার্থীদের মধ্যে সচেতনতা তৈরি করতে হবে। একই সঙ্গে সমস্যায় পড়া কোনো বন্ধুকে অপমান না করে চিকিৎসা ও পেশাদার সহায়তা নিতে উৎসাহিত করা প্রয়োজন।
শাস্তিই কি একমাত্র সমাধান?
মাদক সরবরাহ ও অবৈধ ব্যবসার বিরুদ্ধে কার্যকর আইন প্রয়োগ জরুরি। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের আশপাশে মাদক সরবরাহের অভিযোগ উঠলে নিরপেক্ষ তদন্তের মাধ্যমে ব্যবস্থা নিতে হবে। প্রভাবশালী ব্যক্তি বা গোষ্ঠীর সংশ্লিষ্টতার অভিযোগ থাকলেও তা উপেক্ষা করা উচিত নয়।
তবে মাদকনির্ভরতার সমস্যায় আক্রান্ত শিক্ষার্থীদের শুধু অপমান বা সামাজিকভাবে বিচ্ছিন্ন করে দিলে সংকটের সমাধান নাও হতে পারে। লজ্জা ও সামাজিক অপমানের ভয়ে অনেকে প্রয়োজনীয় চিকিৎসা নিতে দ্বিধা করেন। তাই অপরাধ দমন ও চিকিৎসার প্রয়োজনকে আলাদাভাবে বিবেচনা করতে হবে।
বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে প্রশিক্ষিত কাউন্সেলর কিংবা মানসিক স্বাস্থ্যসেবার সঙ্গে যোগাযোগের ব্যবস্থা সহজলভ্য করা প্রয়োজন। পাশাপাশি পরিবার ও শিক্ষকদের শিক্ষার্থীদের আচরণগত পরিবর্তন, মানসিক অবস্থা এবং সংকটের লক্ষণগুলো সম্পর্কে সচেতন থাকতে হবে।
শিক্ষার্থীদের জন্য খেলাধুলা, সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ড, বিতর্ক, গবেষণা ও স্বেচ্ছাসেবামূলক কাজের সুযোগ বাড়ানোও গুরুত্বপূর্ণ। এসব উদ্যোগ সুস্থ সামাজিক সম্পর্ক ও ইতিবাচক পরিবেশ গড়ে তুলতে সাহায্য করতে পারে।
তরুণদের বাঁচাতে হলে তাদের কথা শুনতে হবে
মাদক প্রতিরোধের দায়িত্ব শুধু পরিবারের নয়, শুধু বিশ্ববিদ্যালয়েরও নয়। এটি পরিবার, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, রাষ্ট্র এবং সমাজের সম্মিলিত দায়িত্ব। শিক্ষার্থীদের নিজেদের সিদ্ধান্ত ও বন্ধুমহল সম্পর্কেও সচেতন হতে হবে।
আমরা প্রায়ই বলি, তরুণরাই দেশের ভবিষ্যৎ। কিন্তু সেই তরুণদের সুস্থভাবে বেড়ে ওঠার পরিবেশ নিশ্চিত করতে কতটা উদ্যোগ নিচ্ছি, সেই প্রশ্নও করা প্রয়োজন।
বিশ্ববিদ্যালয় হবে জ্ঞান, যুক্তি, মানবিকতা ও স্বপ্ন নির্মাণের জায়গা—মাদকনির্ভরতার নয়। এ লক্ষ্য অর্জনে প্রয়োজন কার্যকর সচেতনতা, সহজলভ্য চিকিৎসা, নিরাপদ শিক্ষার পরিবেশ এবং আইনের নিরপেক্ষ প্রয়োগ।
একজন শিক্ষার্থীর সম্ভাবনা রক্ষা করা মানে শুধু একটি জীবনকে রক্ষা করা নয়; এর সঙ্গে জড়িয়ে থাকে একটি পরিবারের স্বপ্ন, সমাজের অগ্রগতি এবং দেশের ভবিষ্যৎ।
