আমার ধর্ম শিক্ষা ও কিছু কথা, জাহিদুর রহমান

 প্রকাশ: ১৩ মে ২০২১, ০২:৫০ পূর্বাহ্ন   |   ধর্ম



----------------------------

ছোটবেলা মক্তবে কায়দা  পড়া, নামাজ শিক্ষার জন্য কয়েকটি ছুরা মুখস্থ করা, তাশাহুদ, দরুদ শরীফ, দো'আকুনুত, নামাজ, রোজা, অজু, গোসল ইত্যাদিসহ দৈনন্দিন ধর্মীয় কার্যক্রমের প্রাথমিক পাঠ গ্রহণ করতাম। আরবি শব্দগুলো বানান করে পড়তে পারলে তখন ঝোলাগুড় আর মুড়ি মিক্সড করে সহপাঠীদের খাইয়ে আনন্দমূখর একটা পরিবেশে পবিত্র কুরআন শরীফ শিক্ষার জন্য হাতে দেয়া হতো। মনে পড়ে পবিত্র কুরআন শরীফ হাতে নেয়ার দিন যতোটা আনন্দিত আর উৎফুল্ল ছিলাম, এসএসসি, কিংবা সম্মান শ্রেণীর ফলাফল পেয়েও অতোটা উৎফুল্ল ছিলামনা, এমনকি মাস্টার্স এর ফলাফল পেয়েও নয়। আর আমাদের এ মক্তব পরিচালনা করতেন আমার এক নানা আলহাজ্ব খলিলুর রহমান, যিনি কয়েক বছর পুর্বে আমাদের ছেড়ে চির শান্তির দেশে চলে গেছেন ( আল্লাহ তাকে জান্নাতুল ফেরদৌসের উচ্চ মাকাম দান করুন)। প্রায় তিন যুগেরও অধিক সময় আমার নানা তার এই মক্তব থেকে আমাদের কতোজনকে এভাবে নামাজ-রোজা,ওঠা বসা, আদব কায়দা ইত্যাদি শিক্ষা দিয়েছেন তার কোনো হিসাব নেই। সকলে উনাকে মুন্সী সাহেব ডাকতেন। নানা কোনো মাদরাসায় পড়া আলেম ছিলেননা।  তাকে দেখতাম ইজি চেয়ার অথবা  চওড়া সেমি চৌকী জাতীয় একটা বেঞ্চে শুয়ে-বসে মুকসুদুল মোমেনীন, বেহেশত ই জেওর এ জাতীয় কোন গ্রন্থ পড়ছেন অথবা পবিত্র কুরআন তেলাওয়াত করছেন; আর এটাই ছিলো তার ধর্ম শিক্ষা। যে শিক্ষার আলোতে শত শত মানুষকে তিনি আলোকিত করে গেছেন।  ওই সময় এমনকি এখনো তিনিই আমাদের কাছে সবচেয়ে সম্মানী মানুষ। 


শিক্ষা জীবনে বাংলাদেশের অন্যতম শ্রেষ্ঠ শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে পড়ালেখা করার সৌভাগ্য হয়েছে, সৌভাগ্য হয়েছে বাংলাদেশের অন্যতম শ্রেষ্ঠ কয়েকজন শিক্ষকের ছাত্র হবার। সকলের কাছ থেকেই শিক্ষা গ্রহণের চেষ্টা করেছি, জানিনা কতটা গ্রহণ করতে পেরেছি।  তবে নিজে যখন চিন্তা করি তখন আমার কাছে মনে হয় - মানবিক মানুষ হওয়ার জন্য, ভদ্র এবং বিনয়ী মানুষ হওয়ার জন্য, দৈনন্দিন ধর্মীয় কার্যাবলী সুচারু রুপে পালন করার জন্য সবচেয়ে বড় শিক্ষা আমার নানার মক্তব থেকেই বেশি পেয়েছি। আর অন্যান্য শিক্ষাগুলো আমার সামাজিক ও পেশাগত কাজে হয়তো ভূমিকা রেখেছে। যতটুকু শিক্ষা গ্রহণ করতে পেরেছি তা আমার যোগ্যতা অনুযায়ী আমাকে  সামাজিক ও পেশাগত স্থান নির্ধারণে সহায়তা করেছে মাত্র। শত দোষত্রুটি থাকা সত্বেও মানুষ হিসেবে যতটুকু মানবিক গুনাবলী নিজের মধ্যে ধারণ করতে পেরেছি, তার অধিকাংশই আমার নানার দেয়া মক্তবের , আমাকে আদর্শলিপি পড়ানো প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষকদের। 

এ প্রসঙ্গে আর একজনের কথা ও বলা প্রয়োজন মনে করছি। তিনি হলেন ক্বারি আবু তাহের, কুমিল্লার মানুষ।  কুমিল্লার উজানি মাদ্রাসা থেকে ক্বারিয়ানা পাশ করে আমাদের মক্তবে মাসে  ২'শ ৫০ টাকা বেতনে শিক্ষক হিসেবে যোগদান করেন।

এই হুজুরকে আমরা ক্বারি সাহেব হুজুর ডাকতাম। ২'শ ৫০ টাকা মাইনে পাওয়া এই হুজুর সকালে মক্তবে আরবি পড়ানোর পাশাপাশি বিকেলে আমাদের খেলাধুলার দর্শক হতেন, ফুটবল খেলায় বাশি  বাজাতেন আবার   সন্ধ্যায় বাংলা, ইংরেজি, গণিতসহ অন্যান্য বিষয়ের স্কুলের পাঠ প্রস্তুত করে দিতেন। 

এজন্য  অভিবাবকদের নিকট থেকে কোনো টাকা পয়সা তিনি গ্রহণ করতেন না। বিনিময়ে যে সম্মান ও সমীহ তিনি আমাদের এবং আমাদের অভিবাবকদের নিকট থেকে পেয়ে গেছেন এবং আমার বিশ্বাস আজও পাচ্ছেন তার কোনো আর্থিক মূল্য হয়না। এদেরকেই আমার কাছে প্রকৃত ধর্ম শিক্ষার গুরু বলে মনে হয়। যারা তাদের ছোট ছোট শিক্ষার্থীদের মনে ধর্মীয় মূল্যবোধের চেতনা জাগ্রত করে দিতে পেরেছেন। মনে পড়ে চতুর্থ শ্রেণীর ছাত্রাবস্থায় একদিন স্কুলে জাতীয় সংগীত পরিবেশনের সময় মূল ভোকালের দায়িত্ব পেয়ে মাঝখানে জাতীয় সংগীত ভুলে গিয়েছিলাম।  ক্বারি সাহেব হুজুর একথা শুনে আসর নামাজ শেষে আমাদের কয়েকজনকে ডেকে বলেছিলেন - আজ তোমাদের একটা শাস্তি দেবো, আর তা হলো বিকেলে খেলতে পারবেনা। আমরা রাজি হলাম। তিনি আমাদের নিয়ে খোলা মাঠে গেলেন এবং আমাদের সাথে অন্তত ত্রিশ বার জাতীয় সংগীত গেয়ে আমাদের জাতীয় সংগীত মুখস্থ করালেন, মুখস্থ করালেন শপথ। আমরা সকলে সেদিন রিহার্সালে পাশ করেছিলাম যার পুরস্কার হিসেবে তার বেতনের ২'শ ৫০ টাকা থেকে ১৫/- টাকার রাণী সুপার বিস্কুট আমাদের খাইয়েছিলেন। 

আজও শ্রদ্ধায় মাথা নতো হয়ে আসে। 

পবিত্র কুরআন তেলাওয়াতের প্রতি এতটা ভালোবাসা তিনি আমাদের মধ্যে জাগ্রত করতে পেরেছিলেন যে- আমরা অনেকে হাটা চালার সময় একা একা কেরাত চর্চা করতাম, গুনগুনিয়ে কোরান তেলাওয়াত করতাম। 

এ ধরনের দেশপ্রেমিক এবং খোদাভীরু নিবেদিত মানুষকেই আমরা ধর্মীয় শিক্ষার গুরু মনে করি।

আমি আমার মক্তবের দু'জন ওস্তাদজীর কথা বলছিলাম। ওই সময়ে প্রায় গ্রামেই আরবি শিক্ষার জন্য মক্তব চলতো। এ মক্তব গুলোতে অধিকাংশ ক্ষেত্রে কুমিল্লা, নোয়াখালী অথবা অন্য কোন এলাকার স্বল্প বেতনভোগী হুজুর থাকতেন, যারা মাওলানা, মুফতি, মোহাদ্দেস, মোফাচ্ছের অথবা আল্লামা এ জাতীয় কোনো টাইটেলধারী ছিলেননা। তারা ছিলেন স্রেফ মৌলভী, মুন্সি অথবা মোল্লা;  বড়জোর তাদেরকে হুজুর সম্বোধন করা হতো। এই মুন্সী সাহেবগণই একেকটা এলাকার শিক্ষার্থীদের ধর্মের প্রাথমিক পাঠ শিক্ষা দিতেন। এই মুন্সী সাহেবদের একবেলা খাওয়াতে পেরে, মাছের মাথা, মুরগির রান তাদের প্লেটে দিতে পেরে আমাদের অভিবাবকরা অন্যরকম এক  তৃপ্তি পেতেন, নিজেরা ধন্য হতেন। আমার মনে হয় নবী রাসুলদের ওয়ারেশ হিসেবে প্রাপ্য মর্যাদা উনারা ধর্মপ্রাণ মুসলিম এমনকি অমুসলিমদের কাছ থেকেও পেতেন। তাদের একবেলা না খাইয়ে, তাদের দোয়া না নিয়ে আমরা পরীক্ষার হলে যেতে চিন্তাও করতামনা। কারণ তারা ধর্মের একাডেমিক কিছু শিক্ষা দেয়ার পাশাপাশি মানুষ হিসেবে গড়ে উঠার শিক্ষা এবং দেশপ্রেমের শিক্ষাও দেয়ার চেষ্টা করতেন। হিন্দু লেখকের জাতীয় সংগীত শিক্ষা দিতে ধর্ম তাদের সামনে ঢাল হয়ে দাড়াতো না। এই মুন্সী সাহেবদেরকেই শিক্ষক, সমাজ সংস্কারক  এবং দেশপ্রেমিক আলেম বলে অন্তত আমার কাছে আজও মনে হয়।

বেশির ভাগ ক্ষেত্রে মুকসুদুল মোমেনীন, বেহেস্ত ই জেওর এ জাতীয় গ্রন্থ পড়া মুন্সী সাহেবদের পবিত্র কুরআন থেকে তাফসির করার, হাজার হাজার হাদিস মুখস্থ করার মতো বিদ্যা না থাকলেও তাদের চিন্তায়, চেতনায়, চরিত্রে, আমলে, জীবন যাত্রায় ইসলামকে তারা ধারণ এবং পালন করতেন। আমাদের মতো হাজার হাজার, লক্ষ লক্ষ সাধারণ শিক্ষায় শিক্ষিত, অর্ধশিক্ষিত এমনকি নিরক্ষর  মানুষের ধর্ম শিক্ষার প্রকৃত শিক্ষাগুরু এই মুন্সী সাহেবরাই। আর তাই আমরা ধর্মকে অন্তরে ধারণ করতে শিখেছি, আমরা দেশকে ভালো বাসতে শিখেছি, এজন্যই আমরা ধর্ম নিয়ে ব্যাবসা করা, স্বার্থ হাসিলের জন্য ধর্মকে ঢাল হিসেবে ব্যাবহার করা  পছন্দ করতে পারিনা। তাইতো আযানের ধ্বনি কানে আসলে সবাই নীরব হয়ে যাই,  নবীর শানের গজল শুনে শিহরিত হই, আল্লাহর শানে হামদ শুনে পুলকিত হই। সে সাথে  জাতীয় সংগীত গাওয়ার সময় অথবা  বাজার সময় আমাদের দেশপ্রেম আমাদের সাড়া দেয়- আমরা দাঁড়িয়ে যাই, সেল্যুট করি লক্ষ প্রানের বিনিময়ে অর্জিত আমাদের লাল-সবুজ পতাকাকে।

মুন্সী সাহেবদের থেকে অর্জিত ধর্ম শিক্ষা আমাদের দেশের আইনকে অমর্যাদা করতে আমাদের শেখায়নি, শেখায়নি জাতীয় সংগীত অথবা জাতীয় পতাকা কে অমর্যাদা করতে। এ কারণেই ধর্ম পালনের পাশাপাশি আমরা দেশের ইতিহাস, ঐতিহ্য ও সংস্কৃতিকেও অমর্যাদা করার শিক্ষা পাইনি। যদি কেউ এমন করেন তবে সেটাকে আমরা ভুল মনে করি, অন্যায় মনে করি এবং অপরাধ মনে করি। 

বিভিন্ন সময়ে তাদের বেসুরো ধর্মীয় আলোচনা - নির্দেশনাকে আমরা আদর্শ মনে করতাম। 

সময়ের পরিবর্তনে ধর্ম বিষয়ক শিক্ষার অনেক প্রসার হয়েছে। নূরানী, হেফজ খানা, আলীয়া, কওমি ইত্যাদি অনেক শিক্ষা প্রতিষ্ঠান থেকে প্রতি বছর হাজার হাজার শিক্ষিত- উচ্চ শিক্ষিত আলেম তৈরী হচ্ছেন, বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়েও এ জাতীয় শিক্ষা এবং  গবেষণা হচ্ছে। তারপরও দেখছি আলেম সমাজের প্রতিনিধিত্বকারী অনেক ব্যক্তি দেশের আইন অমান্য এমনকি   অস্বীকার করে মানুষকে বিভ্রান্ত করার দায়ে গ্রেফতার হচ্ছেন, এক আলেম আরেক আলেমকে বিষদাগার করছেন, এমনকি জুতা প্রদর্শন করছেন,  অনেকের নৈতিক চরিত্রের স্খলনের খবর আমাদের আহত করছে।

আমরা বিভ্রান্ত  হচ্ছি অনেকের উগ্র সাম্প্রদায়িক এবং দেশ বিরোধী বক্তব্য শুনে। অনেক বিশেষজ্ঞ আলেমদের মধ্যে দেশের আইন, শাসন,  শাসক, জাতীয় সংগীত, জাতীয় পতাকা, দেশের ইতিহাস, ঐতিহ্য ও সংস্কৃতির প্রতি অবজ্ঞা অবহেলা, অশ্রদ্ধা  ইত্যাদি বিরাজমান।

কেন যেন দেশের ব্যাপক একটা জনগোষ্ঠী আলেমদের নিয়ে নেতিবাচক মন্তব্য করছেন ; আবার আলেমদের পক্ষে তাদের  অনেক সমর্থকেরা  নোংরা, আশালীন- আশ্রাব্য মন্তব্য করছেন। ভাটা পড়ে যাচ্ছে আলেমদের প্রতি মানুষের ভালোবাসা আর সম্মানের। নানা কারণেই আলেমদের প্রতি সাধারণ মানুষের ভালোবাসা আর শ্রদ্ধার পারদ নীচে নেমে যাচ্ছে। এমনতো হওয়ার কথা নয়, আলেম ওলামা থাকবেন মুসলিম অমুসলিম সকলের কাছে অন্যরকম শ্রদ্ধার জায়গায়। কেন যেন ইদানীং মনে হচ্ছে  মুকসুদুল মোমেনীন আর বেহেশত ই জেওর পড়া মুন্সী সাহেবরা আমাদের সমাজকে যে শিক্ষাটা দিতে পেরেছেন,  যে সম্মান তারা অর্জন করতে পেরেছেন,  আজকের লক্ষ লক্ষ বিজ্ঞ আলেম সমাজ তা ধরে রাখতে পারছেন কিনা। 


আমরা বাংগালী, আমরা ধর্মপ্রাণ আবেগী এক জাতি। ধর্মের ব্যাপারে আমাদের আবেগ খুবই সংবেদনশীল। তারপরও আমাদের দেশে যতোবারই ধর্মকে ব্যবহার করে কোন ব্যক্তি বা গোষ্ঠী তার বা তাদের ব্যক্তিগত অথবা রাজনৈতিক ফায়দা হাসিল করতে চেয়েছেন, আমাদের দেশের ধর্মপ্রাণ মুসলমানরা তাদের সফল হতে দেয়নি, তাদের বিবেক তখন সঠিকভাবেই কাজ করেছে। যার কারণে ধর্ম ব্যাবসায়ীরা এদেশে কখনও সফল হতে পারেননি। 


আমাদের দেশের আলেম সমাজ আমাদের ধর্মীয় ও নৈতিক শিক্ষা দিবেন, আমল-আখলাক উন্নততর করার শিক্ষা দিবেন,  ইসলামের প্রসার ঘটাবেন, রাষ্ট্রকে প্রয়োজনে পরামর্শ দিবেন, তাদের থেকে আমরা উগ্রতা দেখবোনা, তারা নাশকতার বিপক্ষে থাকবেন,  আমাদের ধর্ম পালনের পাশাপাশি সৎ জীবন যাপনের পরামর্শ দিবেন, দেশপ্রেমে উদ্বুদ্ধ করবেন এমন আলেম সমাজ আমাদের দেশে বড়ই প্রয়োজন। তবেই আমাদের এই জাতি ধর্মীয় মূল্যবোধ সম্পন্ন একটি জাতিতে পরিণত হবে আর আমরা কোটি কোটি মানুষ আলেমদের কে মুন্সি সাহেবদের থেকে হাজারগুন বেশি সম্মান করবো।

# জাহিদুর রহমান।প্রচার সম্পাদক 

মুকসুদপুর উপজেলা আওয়ামী লীগ। গোপালগঞ্জ।

ধর্ম এর আরও খবর: